কঙ্কাল সংগ্রহের কোন নীতিমালা নেই

কঙ্কাল সংগ্রহের কোন নীতিমালা নেই

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ভবনের নিচতলায় একটি পোস্টার চোখে পড়ে। এতে লেখা ‘বোনস বিক্রি হবে; ফ্রেশ বোনস আছে। দাম ৩০ হাজার টাকা।’ যোগাযোগ করার জন্য ফোন নম্বর দেওয়া আছে। গত ২৩ ডিসেম্বর হাড় বিক্রির এই পোস্টার দেখার পর কলেজের অ্যানাটমি বিভাগে যোগাযোগ করা হলে অফিস সহকারীরা মরণোত্তর দেহদানের বিষয় সম্পর্কিত একটি নোটিশ দেখিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাননি।

দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, নার্সিং ও হোমিওপ্যাথি কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য মানবকঙ্কাল প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই কঙ্কাল সংগ্রহ সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা নেই। এ কারণে অবৈধ কঙ্কাল বাণিজ্যের চক্র গড়ে উঠেছে। আর সে জন্য বাড়ছে মানুষের লাশ ও কঙ্কাল চুরির ঘটনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মরোণত্তর দেহদান আগের চেয়ে বাড়লেও সেটি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে শিক্ষার কাজে চাহিদার তুলনায় কম। অথচ আগের তুলনায় দেশে মেডিক্যাল কলেজসহ চিকিৎসা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের কঙ্কাল প্রয়োজন হয়। ফলে প্রথম বর্ষে ভর্তির পর কঙ্কালের চাহিদা চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

অভিযোগ আছে, মেডিক্যাল কলেজগুলোর কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থী, অফিস সহকারী ও সরকারি মেডিক্যালের ডোমরা মানবকঙ্কাল বাণিজ্যে জড়িত। মেডিক্যাল কলেজ, কবরস্থানকেন্দ্রিক চক্র দেশে-বিদেশে কঙ্কাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত।মেডিক্যাল শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা মনে করেন, মানবকঙ্কালের চাহিদার কথা বিবেচনা করে এসংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বিকল্প ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাহলে বিভিন্ন ধরনের ডিলার-সিন্ডিকেট থাকবে না। অন্যথায় এই চক্রগুলো দিন দিন বাড়তেই থাকবে।

শুধু বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশের ৯ জেলায় ১৫৯টি কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। শুধু চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সাত জেলায় চুরি হয়েছে ৭৮টি। এর মধ্যে গাজীপুরে ৩০, টাঙ্গাইলে ২১, ঢাকার ধামরাইয়ে চার, দিনাজপুরে ৯, জামালপুরে পাঁচ, পাবনায় এক এবং ময়মনসিংহে আটটি কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত ১৪ নভেম্বর ময়মনসিংহের আর কে মিশন রোডের একটি বাসা থেকে ১২টি মানুষের মাথার খুলি ও দুই বস্তা অন্যান্য অঙ্গের হাড় উদ্ধার করে পুলিশ।

জানা যায়, চক্রের সদস্যরা কবর থেকে লাশ তুলে রাসায়নিক ব্যবহার করে কঙ্কাল তৈরি করে। পরে কয়েক হাত ঘুরে তা আসে মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছে। তখন দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক মোহাম্মদ শাখাওয়াত বলেন, ‘আমি যখন ফার্স্ট ইয়ারে (প্রথম বর্ষে) পড়ি, তখন দুজন মিলে একটি কঙ্কাল সিনিয়রদের কাছ থেকে কিনি। সিনিয়ররা কিভাবে এগুলো সংগ্রহ করে জানি না।’

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে জানান, ঢাকায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় কঙ্কাল পাওয়া গেলেও ঢাকার বাইরের মেডিক্যালগুলোতে কয়েক হাত ঘুরে আসায় দাম হয়ে যায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এখানে রাজনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে অনেক সময় কঙ্কাল বিক্রি করা হয়। একটি সিন্ডিকেট আছে, তারাই এটি নিয়ন্ত্রণ করে। তারা ঢাকার বিভিন্ন সরকারি মেডিক্যালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেওয়ারিশ লাশ সংগ্রহসহ অন্যান্য পন্থা অবলম্বন করে এই চাহিদার জোগান দেয়।

ঢাকা মেডিক্যাল থেকে গত বছর এমবিবিএস পাস করেছেন নিশাত। তিনি বলেন, ‘আমি ২০১৫ সালে ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরনো কঙ্কাল কিনেছিলাম। নতুন কঙ্কাল কিভাবে আসে এটি আমার জানা নেই।’

বিভিন্ন মেডিক্যালের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, সিনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হলেও পুরনো কঙ্কাল ভেঙে গেলে এবং ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেলে নতুন কঙ্কালের প্রয়োজন পড়ে। সে কারণে প্রতিবছরই কঙ্কালের চাহিদা থাকে।

রাজধানীর উত্তরায় শহীদ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রিতা সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সরাসরি কঙ্কাল সংগ্রহ করি না। বিভাগের চাহিদা অফিস কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা বিভিন্ন মেডিক্যালের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসংক্রান্ত কাজে জড়িত ডোম ও অন্যদের মাধ্যমে কিনে থাকে। শিক্ষার্থীরাও নিজেদের প্রয়োজনে বিভিন্ন মাধ্যমে কঙ্কাল সংগ্রহ করে।’

ঢাকা মেডিক্যালের অ্যানাটমি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সেগুপ্তা কিশওয়ারা বলেন, ‘মরণোত্তর দেহদানের মাধ্যমে পাওয়া কঙ্কালগুলো সব সময় চাহিদা পূরণ করতে পারে না। কারণ অনেক সময় কেউ প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেও মারা যাওয়ার পর তাঁর স্বজনরা মরদেহ দেন না, তারা না দিলে কিছু করারও থাকে না। মানবকঙ্কাল পাওয়ার সংকট দূর করতে সামনে পুরোপুরি আর্টিফিশিয়াল মডেল দিয়ে কাজ করতে হবে। আশা করা যাচ্ছে সরকার কঙ্কাল সংগ্রহ ও ব্যবহার পদ্ধতি নিয়ে নীতিমালা এবং সিমুলেশন ল্যাব তৈরি করবে।’ মরণোত্তর দেহদানের প্রতিশ্রুতি অতীতের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে বলে জানান তিনি। তবে সারা দেশে চুরির কঙ্কালগুলো কোথায় যায় সেটি তাঁর জানা নেই।

অনেকে মনে করে, ভালোভাবে শিক্ষার জন্য কৃত্রিম কঙ্কালের চেয়ে আসল কঙ্কালই প্রযোজ্য। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ডা. সেগুপ্তা বলেন, ‘বাইরের দেশগুলোতে আর্টিফিশিয়াল মডেল দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছে। নানা ধরনের ঝক্কি-ঝামেলা দূর করতে সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, সেভাবেই আমরা কাজ করব।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সেলিম রেজা বলেন, ‘আমাদের দেশে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের কঙ্কাল সংগ্রহের বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। নীতিমালা থাকা উচিত।’ তিনি বলছে, কঙ্কাল সংগ্রহের নীতিমালা তৈরি, ব্যবহার ও চুরির বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হলে স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও আইন মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় কঙ্কাল প্রধানত বেওয়ারিশ লাশ থেকে আসে। তার পরও আমরা উদ্যোগ নিয়েছি নতুন একটি সিমুলেশন করার। এটি করতে পারলে কঙ্কালের সংকট পড়বে না। তবে কোনো অবৈধ প্রক্রিয়ায় কঙ্কাল বা হাড়ের ব্যবহার ঘটে বা কবর থেকে উত্তোলনের মতো কিছু হয়ে থাকে, সেটি দেখার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। ওই মন্ত্রণালয়ের এ জন্য একটি আলাদা বিভাগ রয়েছে। এসব তৎপরতার সঙ্গে মেডিক্যালের কোনো সংযোগ নেই। এ ছাড়া আইনের জায়গা থেকেও কিছু করার থাকতে পারে।’

আপনার মতামত লিখুন :